
লেখায় : পার্থজিৎ চন্দ , জগন্নাথদেব মণ্ডল , সৈকত মুখোপাধ্যায় , প্রাণনাথ শেঠ , কুন্তল মুখোপাধ্যায় ও রাজা ভট্টাচার্য
সম্পাদনা : জয়দীপ লাহিড়ী ও শরণ্যা মুখোপাধ্যায়
প্রকাশক: পলান্ন
মূল্য: ১৯৯ টাকা
কবিতা আমি খুব একটা বুঝি না । কিন্তু যতটুকু বুঝি , ভালো লাগে । জীবনে যে কবিতার বই নিয়েও আলোচনা করবো , এক বছর আগেও বোধহয় ভাবতে পারতাম না । সম্প্রতি পড়লাম ছ জন বিশিষ্ট কবির লেখা কবিতা সংকলন " ছয়ে ঋতু "। শুধু পড়লাম বললে বোধ হয় ভুল হবে । ব্যাপারটা অনেক ক্ষেত্রেই এরকম হলো - "পড়লাম , কিছুটা বুঝলাম । আবার পড়লাম , আরো কিছুটা অর্থ বোধগম্য হলো । আরেকবার পড়লাম , এবার কবিতাটা ভালো লাগতে শুরু করলো । শেষে সশব্দে ( পড়ুন প্রায় চিৎকার করে ) পাঠ করতে শুরু করলাম । এইভাবে এক একটা কবিতা চার - পাঁচবার করে পড়েছি । যেগুলো ভালো লেগেছে , বা বুঝতে পেরেছি (বলে মনে হয়েছে) সেগুলো আরো বেশিবার করে পড়েছি ( এবং তার সংখ্যা বেশ বেশিই ) ।
এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো এই বইয়ের ভূমিকা এবং সম্পাদকীয় , বইটির অনন্য সম্পদ । পরবর্তী পাঠকের কাছে অনুরোধ থাকবে এ দুটিকে এড়িয়ে না যেতে । বরং সবচেয়ে ভালো হয় সম্পাদকীয়টি প্রথমে পড়ে নিয়ে কবিতাগুলি কে পড়া শুরু করা এবং ঋতুভিত্তিক কবিতা যাপনের আগে তার সঙ্গে সম্পর্কিত ভূমিকাটি একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া ।
প্রত্যেক ঋতু নিয়ে মোট সাতটি করে কবিতা আছে পূর্বোক্ত কবিদের শক্তিশালী কলমে আর আছে একটি করে সংক্ষিপ্ত অথচ মনোগ্রাহী ভূমিকা।
আসুন তাহলে শুরু করা যাক ।
দেখে নিই কেমন হলো এই ছয় ঋতুর সমাহার ।
গ্রীষ্ম - পার্থজিৎ চন্দ
পার্থজিৎ বাবুর লেখা আগে পড়িনি । পড়তে গিয়ে বুঝলাম এই কবিতার রস সম্যক উপলব্ধি করতে গেলে নিজের পড়াশোনার পরিধি আরো বাড়াতে হবে। না হলে বোধহয় পূর্ণরস আস্বাদনে বঞ্চিত থেকে যাবো । তবে এ নিছকই আমার অযোগ্যতা । যতটুকু বুঝেছি , কবির শব্দচয়ন , বিষয় ভাবনা আমাকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে । প্রথম কবিতার নাম মাতৃক্রোড় এবং প্রথম বলেই ছক্কা । ব্যক্তিগতভাবে ভীষণ ভালো লেগেছে । দুটি পংক্তি তুলে ধরলে বোঝা যাবে হয়তো কেন -
" মানুষেরা গোধূলিতে উঠে আসছে ছাদে , টিলার ওপর , নিঃসঙ্গ বিষণ্ণ মানুষ .... প্রতিটি মানুষের বুকের ভিতর সূর্য ডুবে যাচ্ছে , টেথিস সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে আধো - অন্ধকারে । "
'লেডি ম্যাকবেথ রাত' বা ' বহিরাগত ' ঋদ্ধ পাঠকের নিশ্চয়ই ভালো লাগবে । যেটা আগেও বলছিলাম , একটু পড়াশোনা থাকলে পাঠক নিশ্চিতভাবেই রস আস্বাদনে সমর্থ হবেন । ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ যদিও 'প্রলয়ের পর' এবং অবশ্যই 'জীর্ণ দেউল , মঙ্গলবার' ।
গ্রীষ্মের রুদ্ররুপ এভাবেই এ শীতের মধ্যে উষ্ণতার আবেশ এনে দেয় । বুকের ভিতর সেই আগুন আঁচ নিয়েই চলুন পাড়ি দি পরবর্তী ঋতুর কাছে , চলুন ভিজি একসাথে ।
বর্ষা - জগন্নাথদেব মণ্ডল
জগন্নাথের কবিতার পরতে পরতে পেলাম মাটির সোঁদা গন্ধ। সহজিয়া ভাব । আর এইবারের বর্ষণমুখর শীতের মধ্যে আরো বেশি করে যেন মনে হলো বর্ষাকালেই বর্ষার কবিতা পড়ছি । রাধা কৃষ্ণের প্রেমের ব্যাকুলতা , রাধার পাগলিনী ভাব , বর্ষার প্রেক্ষাপটে চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি । এক একটি পংক্তি যেন এক একটি বিরহের অলঙ্কার । অপূর্ব বাক্যগঠন , শব্দের ব্যবহার পাঠকের চোখে যেন ঘোর লাগিয়ে দেয় , মায়াজালে আচ্ছন্ন করে মন ।
যখন তিনি বলেন - " গোয়ালে গাভির চক্ষু বেয়ে সন্ধ্যা আসে , বিরহিনী জলের নীরব কান্নাতে ফোটে কমলমুকুলদল " বা " বিসমিল্লাহের কবরের পাশে ঝিঁ ঝিঁ র সানাই" , তখন নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেড়িয়ে আসে বাহবা ।
শিরোনাম বর্জিত কবিতাগুলির মধ্যে কোন একটি বা দুটি কবিতাকে প্রিয় কবিতা হিসেবে বেছে নেওয়া শক্ত , কারণ বৃষ্টিধারার মতোই তাদের সৌন্দর্য একত্রেই ।
শরৎ - সৈকত মুখোপাধ্যায়
গদ্যকার সৈকত মুখোপাধ্যায় আমার বরাবরই প্রিয় । অতি সম্প্রতি পরিচয় হয়েছে তাঁর কবিতার সাথে আর প্রথম দর্শনেই যে প্রেম , তা প্রায় মুগ্ধতায় পর্যবসিত হয়েছে এই বইটিতে তাঁর কবিতাগুচ্ছ পাঠ করার পর । এভাবেও শরৎ কে নিয়ে লেখা যায় !!! এভাবে তো কখনো ভাবিনি শরৎকে নিয়ে । প্রিয় লেখকের কলমে ধরা দিয়েছে চিরচেনা শরৎ এক অজানা , অচেনা রূপে , আর সেই রূপের ছটায় ভেসে গিয়েছি আমি , ভেসে গিয়েছি সেই সব পরিবারের মতোই যাদের উপার্জনকারী সদস্য কখনো হয়তো দেবীকাঠামোর টানেই রাত্রির নদীতে গিয়েছে ভেসে । শরতের উৎসবমুখর রূপের আড়ালে যে দীনতা , অভাব লুকিয়ে থাকে , তাকে অসামান্য দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন কবি । প্রতিটি কবিতাই দুর্দান্ত । ব্যক্তিগত পছন্দ , শিরোনাম বর্জিত এক , দুই , তিন এবং ছয় ।
হেমন্ত - প্রাণনাথ শেঠ
প্রাণনাথ বাবুর সাবলীল কলমে ধরা পড়েছে হেমন্তের উৎসবের আমেজটি । নবান্ন উৎসবকে মাথায় রেখে দুঃখ কষ্ট ভুলে বাংলার ঘরে ঘরে যে উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয় , তার ছোঁয়া লাগে হীরামনি, মালতী আর সজলের অভাবী জীবনেও । কবিতার মধ্যে দিয়ে এক সুন্দর কাহিনী বলেছেন প্রাণনাথ । জীবনের ছোট বড় চাওয়া-পাওয়া , না পাওয়া সব মিলিয়েই মানবতার জয়গানে পরিণত হয়েছে এই কবিতাগুচ্ছ, সমাপ্ত হতে হতে । ভালো লাগে , মনে দাগ কেটে যায় ।
শীত - কুন্তল মুখোপাধ্যায়
কুন্তলবাবুর "হলুদ উলের গোলা" এই কবিতা সংকলনের অহংকার । এক ঝলক দেখে অহংকারী কুয়াশা বলে মনে হলেও , যখন আপনি সেই আপাত শীতল কবিতাপথ দিয়ে হেঁটে যাবেন , আপনার সামনে একটু একটু করে বুনে উঠতে দেখবেন ভালোবাসার গরম জামা । শীতের নরম রোদ আর রাতের হিমদ্যুতি , সবই ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে আপনার কাছে । প্রয়োজন শুধু একটু ধৈর্যের পাঠক , নয়তো আপনার দ্রুত পদক্ষেপে হয়তো শিশিরকণার সাথে সাথে অপমৃত্যু ঘটবে কিছু অমরত্ব প্রত্যাশী কবিতারও । ব্যক্তিগত পছন্দ শিরোনামবিহীন এক , দুই এবং অবশ্যই ছয় ।
" শীতের হলুদ রোদ , অদৃশ্য রুমালে বেঁধে দিয়েছি রাতের হিমদ্যুতি
সকালে মাঠের লূতাতন্তুজালে সারি সারি শিশিরের সার্কাসের চ্যুতি "
এবং
বসন্ত - রাজা ভট্টাচার্য
ঋতুরাজ বসন্ত । তাকে নিয়ে লিখেছেন আরেক রাজা এবং যথারীতি নিজের অননুকরণীয় ভঙ্গিমায় পাঠকের মনসাম্রাজ্যের দখল নিয়েছেন অবলীলায় তাঁর লীলাতত্ত্বের মাধ্যমে ।
রাইকিশোরী আর কানুর পূর্বরাগ , রূপানুরাগ , মান , অভিসার , মিলন , বিরহ এবং মাথুর সবই চিত্রিত হয়েছে এ কালের পটভূমিতে । যেখানে
শূন্যগলি আর পদাবলী হাত ধরাধরি করে চলে , রেসিং সাইকেল এর অনন্য গতিতেও পথ হয় অফুরান । পড়েই দেখুন না পরবর্তী পাঠক । পূর্ববর্তী পাঠকের মতন আপনিও দেহ মনে বাঁধা পড়বেনই তার অপরিসীম সৌন্দর্যে ।
" আজিও কাঁদে কি রাধা হৃদয়কুটিরে ?
আজও আছে সেই সন্ধ্যা , হেমন্তর গান ?
ঘরে যাইতে পথ আজও হয় অফুরান ?
রেসিং সাইকেলে আছে ? সেই শূন্যগলি ?
সেই সব কিছু খোঁজে এই পদাবলি ।।"
একমাত্র রাজা ভট্টাচার্যেরই আছে আটটি কবিতা এই আশ্চর্য সংকলনে , কারণ তাঁর ভূমিকাটি ও একটি অপরূপ কবিতা । লীলাতত্ত্ব সমাপন করে যদি পাঠক ফিরে যান সে আরম্ভে , তবে নিশ্চিতই ফের অভিভূত হবেন ঘরে-বাইরে । সব কিছুর খোঁজ যে রাজা দিয়ে গেছেন শুরুতেই ।
নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত একটি প্রচেষ্টা "ছয়ে ঋতু" । অত্যন্ত যত্ন নিয়ে করা একটি কাজ । সেই যত্ন ফুটে উঠেছে বইটির পাতায় পাতায় , হরফসজ্জাতে , ভূমিকাতে এবং সম্পাদকীয়তেও । কেবল মাঝে মাঝে একটু তাল কেটেছে কিছু বানানচ্যুতিতে । তবে সে সংখ্যা খুব বেশি নয় । প্রচ্ছদ অনবদ্য । এরকম একটি প্রচ্ছদ দেখলেই তো বইটি হাতে নিতে ইচ্ছে করবে । বইয়ের পাতার মানও বেশ ভালো ।
এ ধরণের কাজ বাংলা কবিতার বইয়ের মধ্যে সাম্প্রতিক কালে হয়েছে কিনা আমার জানা নেই । যারা কবিতা ভালোবাসেন তাদের জন্য অবশ্য সংগ্রহযোগ্য ।
✍️ সুসংগীত দাস ©️